logo
মতামত

আমাদের তৃতীয় হাত

মঞ্জুর চৌধুরী২৯ অক্টোবর ২০২৫
Copied!
আমাদের তৃতীয় হাত
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ঢাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মাত্র ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। একটা মানুষের জীবনের মূল্য মাত্র ৫ লাখ।

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে এমন অপঘাতে সাধারণ মানুষেরাই মরে, ভিআইপি বা তাদের আত্মীয়স্বজন মরে না। মরলে প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসত।

ঘটনাটা নিশ্চই একদিনে ঘটেনি। দিনের পর দিন মেইন্টেইনেন্সের অভাবে এইসব জিনিস ক্ষয় হয়। কথা হচ্ছে, এসব রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব কার? তিনি দায় স্বীকার করবেন না, এইটা নিশ্চিত। আমাদের দেশে এই কালচার কখনই ছিল না। আমরা সবসময়েই নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে অভ্যস্ত।

নিহত ব্যক্তির পরিবারকে যে, ৫ লাখ টাকা দিয়েছে, এইতো অনেক। আমিতো প্রত্যাশা করেছিলাম সরকার থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হবে, ‘কাজটা বিরোধী দলের। ওরা পিলার ধরে নাড়াচাড়া করেছে, তাই ওটা খসে গেছে।’

কথাটা পরিচিত মনে হচ্ছে? একটা বহুতল ভবন ধ্বসের সময়ে আমাদের এক আওয়ামী ‘জনপ্রতিনিধি’ এমন কমেন্ট করেছিলেন। তিনি খুব সম্ভব সরাসরি বিএনপির নাম নিয়েছিলেন।

এখন বিরোধী দলের নাম বিএনপির পরিবর্তে আওয়ামী লীগ বসিয়ে দিলেই চলবে।

এক দল দাবি করছে, এর দায় শেখ হাসিনা সরকারের। দুর্নীতি করেছে, তাই এইভাবে খসে খসে পড়ছে।

এইটাও অবান্তর। আমি আমেরিকার উদাহরণ দিই, তাহলে সহজে বুঝতে পারবেন আমি কী বোঝাতে চাইছি।

আমেরিকায় স্কুল জীবন থেকেই আমাদের ট্রেনিং দেওয়া হয় যখন তোমাকে কোন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটাকে সম্পন্ন করার দায়িত্ব তোমার। তুমি কীভাবে করবে, সেটাও তোমার দায়।

‘আমি অসুস্থ ছিলাম’, ‘আমি এসাইনমেন্ট শেষ করে প্রিন্ট করেছিলাম, কিন্তু আমার কুকুর সেটা খেয়ে ফেলেছে’, ‘আমার দাদি/নানি মারা গেছে’— ইত্যাদি কোন বাহানা কাজে আসবে না। আমার এক বন্ধু প্রতি সেমিস্টারে ওর দাদিকে মেরে ফেলত। একদিন ওর টিচারই জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘তোমার কয়টা দাদি যে দুই দিন পরপর মরেন?’

বন্ধু জবাবে বলেছিলেন, ‘দাদা ৪টা বিয়ে করেছিলেন।’

তেমনই ‘আগের ম্যানেজার এই/ওই করে গেছে’—এটা কোনো অজুহাত না। আমাদের হাত দুইটাই, ডান আর বাম, ‘অজুহাত’ নামে তৃতীয় কোনো হাত আমাদের থাকতে পারে না। কিন্তু বাঙালি তিন হাতের জাতি।

আগের ম্যানেজার পারেনি বলেই তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তুমি না পারলে হয় স্টেপ ডাউন করো, না হলে তোমাকে বরখাস্ত করে নতুন কাউকে নেওয়া হবে, যে কাজটা ঠিকঠাকভাবে শেষ করতে পারবে।

তা এখন এই ব্যাপারটাই আমাদের দৃশ্যপটে এপ্লাই করেন।

আগের সরকার ভোটচোর ছিল, স্বৈরাচারী ছিল, দুর্নীতিবাজ ছিল, গণহত্যাকারী ছিল—তাদের হটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বসানো হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, এটা দীর্ঘ সময়। এত দিনে আস্ত দেশ মোটামুটি একটা shape–এ চলে আসার কথা। এখন কোনো অজুহাত নেই, ‘আগের সরকার এই করে গেছে, তাই দায় ওদের’ বলার। যেমনটা আওয়ামী লীগ করত। ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকেও আহাম্মকগুলো বিএনপি সরকারের ওপর দায় চাপাত। বিএনপিও একই কাজ করত।

এই সরকারও যদি একই কাজ করে, তাহলে বদলালো কী?

সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, আমরা ১৯৭১ সালে। সিঙ্গাপুর ছিল একটা বস্তি জনপদ, আমরা ছিলাম যুদ্ধবিদ্ধস্ত। আজকে সিঙ্গাপুর বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ, আর আমরা? কেন? কারণ আমাদের ওই তৃতীয় হাত, ‘অজুহাত’।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*মঞ্জুর চৌধুরী. ডালাস, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

আরও দেখুন

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, শিল্পীর অন্ধ রাজনীতি ও সংস্কৃতির বন্দিত্ব

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, শিল্পীর অন্ধ রাজনীতি ও সংস্কৃতির বন্দিত্ব

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ব্যবস্থাও এই সংকটকে গভীর করেছে। সম্মাননা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ না করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব—এসব কারণে রাষ্ট্রের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

২ দিন আগে

নির্বাচন ভাবনা: জনরায়ের বার্তা ও আগামীর রাজনৈতিক সমীকরণ

নির্বাচন ভাবনা: জনরায়ের বার্তা ও আগামীর রাজনৈতিক সমীকরণ

এই নির্বাচন কেবল আসনসংখ্যার হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত। তরুণ প্রজন্ম, ডিজিটাল রাজনীতি এবং সুশাসনের প্রশ্ন এখন নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই এটি আত্মসমালোচনা ও নীতিগত পুনর্গঠনের সময়।

১১ দিন আগে

ভালোবাসা যার আর কোনো নাম নেই

ভালোবাসা যার আর কোনো নাম নেই

আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস‍্যা নেই।

১২ দিন আগে

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।

১৬ দিন আগে