

সৈয়দ ইজাজ আহসান

অভিবাসনের ইতিহাস মোটেই সংক্ষিপ্ত বা কেবল সমসাময়িক নয়। মানবজাতির ইতিহাসের সঙ্গেই এই প্রক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমনকি মানবসভ্যতার সূচনারও বহু আগে মানুষ নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানান্তরিত হয়েছে। তখন দেশান্তরে যেতে পাসপোর্ট বা ভিসার প্রয়োজন ছিল না; মানুষ ছুটে চলত নতুন জীবনের খোঁজে। তাই অভিবাসন মানবজাতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৭০ থেকে ১ লাখ বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স পূর্ব আফ্রিকা থেকে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক অভিবাসনের সূচনা সেখান থেকেই। পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব অভিবাসনে নতুন গতি আনে। উর্বর জমির সন্ধানে মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে শুরু করে। এভাবে মধ্যযুগ অতিক্রম করে মানুষ আধুনিক যুগে প্রবেশ করে।
১৪০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উপনিবেশবাদ এবং আটলান্টিকের কুখ্যাত দাসব্যবসার যুগ। লাখ লাখ মানুষকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়। প্রিয়জন, মাতৃভূমি সবকিছু ছেড়ে বলপূর্বক নির্বাসিত হওয়ার সেই হৃদয়বিদারক ইতিহাস আজও মানবসভ্যতার কলঙ্ক।
বর্তমানে দাসপ্রথা নেই, কিন্তু অভিবাসনের ধারা থেমে নেই। উনিশ শতকের পর থেকে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। আবার উন্নত জীবনের আশায় অনেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমৃদ্ধ দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। কাজেই অভিবাসন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া কোনো প্রবণতা নয়। অথচ আজকের পৃথিবীর কিছু উন্নত দেশ অভিবাসীদের এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে, যেন তাদের পূর্বপুরুষেরা কখনো অভিবাসী ছিল না।
অভিবাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ১৪৯২ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইউরোপীয় নতুন আবিষ্কৃত এই ভূখণ্ডে এসে বসতি গড়ে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জনসংখ্যার চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জমির স্বল্পতা ছিল এর প্রধান কারণ। ধারণা করা হয়, এই সময়ে প্রায় ৬ কোটি ইউরোপীয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসে।
কিন্তু আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের পেছনে অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। আফ্রিকা থেকে আনা ক্রীতদাসদের শ্রম, পরবর্তীকালে ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আগত দক্ষ অভিবাসীদের মেধা—সব মিলেই দেশটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আজ সেই দেশেই অভিবাসীদের একাংশ অবাঞ্ছিত হয়ে উঠছে।
শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নয়—ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নের পেছনেও রয়েছে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের অবদান। দুবাই, আবুধাবি বা দোহা—এই শহরগুলোর আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, বিলাসবহুল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে দরিদ্র দেশ থেকে আসা শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমে। তবুও তারা প্রবাসী, প্রায়শই অধিকারবঞ্চিত।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। বিপুল ঋণভার, সুদের চাপ, অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের উদ্বেগ—এসব বিষয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। ধনী ও দক্ষ অভিবাসীদের স্বাগত জানানো হলেও দরিদ্র ও অনিয়মিত অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের কথাও প্রাসঙ্গিক। বহু মেধাবী তরুণ একসময় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পাড়ি দেওয়াকে জীবনের সাফল্য ভাবত। কিন্তু অভিবাসনের পথ অনেক সময় ভয়াবহ। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। তবুও উন্নত দেশগুলো শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে অভিবাসীদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারে না।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি দুঃস্বপ্নের অভিবাসনের পথে হাঁটব, নাকি নিজের দেশকে স্বপ্নের দেশে পরিণত করার চেষ্টা করব? প্রবাসীরা জানেন, বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা আছে। সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠলে মানুষের বাধ্যতামূলক দেশত্যাগ কমে আসতে পারে।
স্বপ্নের দেশ দূরে নয়—আমাদের নিজেদের মধ্যেই তার বীজ রয়েছে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
ড. সৈয়দ ইজাজ আহসান: বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাস্কাট, ওমান। ইমেইল: [email protected]

অভিবাসনের ইতিহাস মোটেই সংক্ষিপ্ত বা কেবল সমসাময়িক নয়। মানবজাতির ইতিহাসের সঙ্গেই এই প্রক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমনকি মানবসভ্যতার সূচনারও বহু আগে মানুষ নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানান্তরিত হয়েছে। তখন দেশান্তরে যেতে পাসপোর্ট বা ভিসার প্রয়োজন ছিল না; মানুষ ছুটে চলত নতুন জীবনের খোঁজে। তাই অভিবাসন মানবজাতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৭০ থেকে ১ লাখ বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স পূর্ব আফ্রিকা থেকে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক অভিবাসনের সূচনা সেখান থেকেই। পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব অভিবাসনে নতুন গতি আনে। উর্বর জমির সন্ধানে মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে শুরু করে। এভাবে মধ্যযুগ অতিক্রম করে মানুষ আধুনিক যুগে প্রবেশ করে।
১৪০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উপনিবেশবাদ এবং আটলান্টিকের কুখ্যাত দাসব্যবসার যুগ। লাখ লাখ মানুষকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়। প্রিয়জন, মাতৃভূমি সবকিছু ছেড়ে বলপূর্বক নির্বাসিত হওয়ার সেই হৃদয়বিদারক ইতিহাস আজও মানবসভ্যতার কলঙ্ক।
বর্তমানে দাসপ্রথা নেই, কিন্তু অভিবাসনের ধারা থেমে নেই। উনিশ শতকের পর থেকে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। আবার উন্নত জীবনের আশায় অনেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমৃদ্ধ দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। কাজেই অভিবাসন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া কোনো প্রবণতা নয়। অথচ আজকের পৃথিবীর কিছু উন্নত দেশ অভিবাসীদের এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে, যেন তাদের পূর্বপুরুষেরা কখনো অভিবাসী ছিল না।
অভিবাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ১৪৯২ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইউরোপীয় নতুন আবিষ্কৃত এই ভূখণ্ডে এসে বসতি গড়ে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জনসংখ্যার চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জমির স্বল্পতা ছিল এর প্রধান কারণ। ধারণা করা হয়, এই সময়ে প্রায় ৬ কোটি ইউরোপীয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসে।
কিন্তু আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের পেছনে অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। আফ্রিকা থেকে আনা ক্রীতদাসদের শ্রম, পরবর্তীকালে ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আগত দক্ষ অভিবাসীদের মেধা—সব মিলেই দেশটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আজ সেই দেশেই অভিবাসীদের একাংশ অবাঞ্ছিত হয়ে উঠছে।
শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নয়—ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নের পেছনেও রয়েছে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের অবদান। দুবাই, আবুধাবি বা দোহা—এই শহরগুলোর আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, বিলাসবহুল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে দরিদ্র দেশ থেকে আসা শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমে। তবুও তারা প্রবাসী, প্রায়শই অধিকারবঞ্চিত।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। বিপুল ঋণভার, সুদের চাপ, অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের উদ্বেগ—এসব বিষয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। ধনী ও দক্ষ অভিবাসীদের স্বাগত জানানো হলেও দরিদ্র ও অনিয়মিত অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের কথাও প্রাসঙ্গিক। বহু মেধাবী তরুণ একসময় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পাড়ি দেওয়াকে জীবনের সাফল্য ভাবত। কিন্তু অভিবাসনের পথ অনেক সময় ভয়াবহ। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। তবুও উন্নত দেশগুলো শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে অভিবাসীদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারে না।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি দুঃস্বপ্নের অভিবাসনের পথে হাঁটব, নাকি নিজের দেশকে স্বপ্নের দেশে পরিণত করার চেষ্টা করব? প্রবাসীরা জানেন, বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা আছে। সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠলে মানুষের বাধ্যতামূলক দেশত্যাগ কমে আসতে পারে।
স্বপ্নের দেশ দূরে নয়—আমাদের নিজেদের মধ্যেই তার বীজ রয়েছে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
ড. সৈয়দ ইজাজ আহসান: বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাস্কাট, ওমান। ইমেইল: [email protected]
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ব্যবস্থাও এই সংকটকে গভীর করেছে। সম্মাননা প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ না করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব—এসব কারণে রাষ্ট্রের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এই নির্বাচন কেবল আসনসংখ্যার হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত। তরুণ প্রজন্ম, ডিজিটাল রাজনীতি এবং সুশাসনের প্রশ্ন এখন নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই এটি আত্মসমালোচনা ও নীতিগত পুনর্গঠনের সময়।
আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস্যা নেই।
তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।