logo
প্রবাসের খবর

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে

বিডিজেন ডেস্ক
বিডিজেন ডেস্ক১০ দিন আগে
Copied!
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে

কয়েক দশক ধরে সহিংস অস্থিরতায় জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবসার নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। কিন্তু সেই অস্থিরতার ঢেউ এখন দেশটিকেই আঘাত করছে, যা তার অর্থনৈতিক মডেলকে নজিরবিহীনভাবে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউএই যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়া দেশগুলোর একটি। এসব হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে আমিরাতের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। পর্যটন ও সম্মেলন খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ইরানের ঠিক পারস্য উপসাগরের ওপারে অবস্থিত দেশটি পরিস্থিতিতে বিচলিত নয়—এমন ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যদিও বাস্তবে তারা বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। সম্প্রতি তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে আরেকটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ওপেক তেল জোট থেকেও বেরিয়ে এসেছে—যা যুদ্ধ শুরুর আগেই বিবেচনায় ছিল।

যদিও যুদ্ধ শুরু করেছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু ইউএই এই যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। গত আমিরাতের রোববার বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চলমান ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে—এমনকি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও।

বিপুল নগদ অর্থের মজুত থাকায় যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের চাকরি হারানো বা বিদেশি ব্যবসার ব্যাপক প্রস্থান দেখা যায়নি। তবে অচলাবস্থা যত দীর্ঘ এবং স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য যত ব্যাহত হবে, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ইউএইর ভাবমূর্তি তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আমিরাতের কর্মকর্তারা ক্রমেই ইরানের বিরুদ্ধে জলদস্যুতা এমনকি সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলছেন এবং সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন।

রোববার রাতে ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “কোনো অবস্থাতেই ইউএই তার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি সহ্য করবে না। যেকোনো হুমকি, অভিযোগ বা শত্রুতার জবাব দিতে দেশটি তার পূর্ণ সার্বভৌম, বৈধ, কূটনৈতিক ও সামরিক অধিকার সংরক্ষণ করে।”

আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি

বারাকাহ হামলার জবাবে ইউএই কী পদক্ষেপ নেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। হামলায় কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি এবং আবুধাবির পশ্চিম মরুভূমিতে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি।

ইউএই ৭টি শেখশাসিত অঞ্চলের একটি ফেডারেশন। এর মধ্যে দুবাই ও আবুধাবি রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাসন কাঠামো ফেডারেল সুপ্রিম কাউন্সিল, যেখানে ৭ আমিরাতের বংশানুক্রমিক শাসকেরা সদস্য। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও তার পরিবারের।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশকে শাসক পরিবার আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এ ছাড়া, ২০১৩ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা এবং সুদান ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে, যদিও ইউএই তা অস্বীকার করে।

সাধারণত খুব কম প্রকাশ্যে কথা বলা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান গত মার্চে ইরানি হামলায় আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “ইউএই আকর্ষণীয়, ইউএই সুন্দর, ইউএই একটি মডেল রাষ্ট্র। কিন্তু আমি বলছি—ইউএইর বাহ্যিক চেহারা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। ইউএইর চামড়া পুরু এবং মাংস তিক্ত; আমরা সহজ শিকার নই।”

তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো ক্ষতি হয়নি।

অর্থনৈতিক সতর্ক সংকেত

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইউএইর তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে, যদিও কিছু ট্যাংকার বের হতে পেরেছে। প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর তীরবর্তী ফুজাইরাহ শহরে থাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা সম্ভব। সেই সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে দ্বিতীয় পাইপলাইন নির্মাণ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটি।

ইউএইর পর্যটন ও সম্মেলন বাজার—যা দেশটির অর্থনীতির ১২ শতাংশেরও বেশি—তাও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ইউএইতে নির্ধারিত ৭০টির বেশি অনুষ্ঠান স্থগিত, বাতিল বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান নর্থবোর্ন অ্যাডভাইজরি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, তবে “বিমা প্রত্যাহার ও দায়বদ্ধতার ঝুঁকি” বিবেচনায় আয়োজকেরা পরিকল্পনা বদলেছেন।

গত ৪ মে দেশের বিমান সংস্থা এমিরেটস ঘোষণা দেয় যে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের প্রায় পূর্ণ ফ্লাইট সূচি পুনরায় চালু হয়েছে। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর। কিন্তু একই দিন ইরান একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, ফলে মোবাইলে সতর্কবার্তা আসে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আগ্রহী।

বিমানবন্দরটি তাদের জেট জ্বালানির ট্যাংকের চারপাশে সুরক্ষামূলক কাঠামো নির্মাণ করছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

দুবাইয়ের আইকনিক পাল-আকৃতির বুর্জ আল আরবসহ বিভিন্ন হোটেল সংস্কারের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। পর্যটক থাকার হার নেমে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশে। মুডিজ অ্যানালিটিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন প্রান্তিকে তা ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যেখানে যুদ্ধের আগে এই হার ছিল ৮০ শতাংশ।

মুডিজ সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়েও হোটেলে পর্যটক থাকার হার কম থাকতে পারে, কারণ সংঘাত কমে গেলেও ভ্রমণকারীদের মধ্যে দ্বিধা বজায় থাকবে।

সোমবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স বলেছে, “দুবাইয়ের উন্মুক্ত অর্থনীতি ভ্রমণ, লজিস্টিকস ও আস্থাজনিত ধাক্কায় ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে আবুধাবির আর্থিক সক্ষমতা ও জ্বালানি সম্পদ পুরো ফেডারেশনকে এই ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা দিচ্ছে।”

কয়েনচালিত যুদ্ধবিমান শিল্পকর্ম

দুবাই এখনো নিজেকে উন্মুক্ত শহর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

গত সপ্তাহান্তে সেখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বার্ষিক আর্ট দুবাই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধের প্রভাব সেখানে স্পষ্ট ছিল, কারণ প্রদর্শনীর উদ্বোধনের দিনই ইরান ফুজাইরাহ উপকূলে নোঙর করা একটি জাহাজ জব্দ করে।

একটি শিল্পকর্মে দেখা যায়, কয়েনচালিত কালো যুদ্ধবিমান, যার গায়ে জোড়া জোড়া কালো নাইকি টেনিস জুতা লাগানো।

স্পেনের শিল্পী সোলিমান লোপেজ একটি শিল্পকর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যেখানে তিনি নাসার অভিযানের লক্ষ্য ধাতুসমৃদ্ধ একটি গ্রহাণুর মালিকানা দাবি করার ধারণা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, শিল্পকর্মটি মূলত দেশ ও কোম্পানিগুলোর তেল ও অন্য সম্পদ আহরণের বিষয়টি প্রতিফলিত করে।

তিনি বলেন, “এই সংঘাতের কারণে কাজ নিয়ে এখানে আসা কঠিন ছিল। কিন্তু আমি ভেবেছি, আমাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেই হবে, কারণ আমি বিশ্বাস করি এই অঞ্চলে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রেক্ষাপট।”

বৈরুতের শিল্পী আলফ্রেড তারাজি বলেন, তার দাদা-দাদি দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময় বেঁচে ছিলেন।

তিনি বলেন, “বিশ্বযুদ্ধ হলেও জীবন থেমে থাকে না। সহিংসতার বয়ানের মোকাবিলা আমরা কেবল সংস্কৃতির মাধ্যমেই করতে পারি।”

আরও দেখুন

আমিরাতে বিতাড়নের শিকার হচ্ছেন পাকিস্তানি শিয়ারা, জমানো অর্থ–লাগেজ কিছুই নিতে পারছেন না

আমিরাতে বিতাড়নের শিকার হচ্ছেন পাকিস্তানি শিয়ারা, জমানো অর্থ–লাগেজ কিছুই নিতে পারছেন না

পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর বিতাড়নের ঘটনা আরও বেড়েছে। এই সংঘাতের কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

৩ দিন আগে

আমেরিকার গ্রিন কার্ড পেতে হলে ফিরতে হবে নিজ দেশে

আমেরিকার গ্রিন কার্ড পেতে হলে ফিরতে হবে নিজ দেশে

ইউএসসিআইএসের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি যদি সাময়িকভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন এবং গ্রিন কার্ড পেতে চান, তবে তাকে অবশ্যই নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হবে।

৬ দিন আগে

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে

বিপুল নগদ অর্থের মজুত থাকায় যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের চাকরি হারানো বা বিদেশি ব্যবসার ব্যাপক প্রস্থান দেখা যায়নি। তবে অচলাবস্থা যত দীর্ঘ এবং স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য যত ব্যাহত হবে, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ইউএইর ভাবমূর্তি তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

১০ দিন আগে

অস্ট্রেলিয়ায় স্ত্রী ও দুই প্রতিবন্ধী সন্তান হত্যার অভিযোগে বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

অস্ট্রেলিয়ায় স্ত্রী ও দুই প্রতিবন্ধী সন্তান হত্যার অভিযোগে বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের অ্যাকটিং সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মরোনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা এতটাই বিভৎস যে বিস্তারিত প্রকাশের যোগ্য নয়।

১০ দিন আগে