logo
মতামত

খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং নীরব শক্তির প্রতিচ্ছবি

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা৩০ নভেম্বর ২০২৫
Copied!
খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং নীরব শক্তির প্রতিচ্ছবি
খালেদা জিয়া। ছবি: সুদীপ্ত সালাম

উপমহাদেশের সমৃদ্ধ কিন্তু উত্তাল ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম এক আলাদা অধ্যায়। ব্যক্তিগত বেদনা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অদম্য পরিচয়, যা তাকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তিনি ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনন্য মর্যাদা অর্জন করেন।

একটি সাধারণ সংসারে বড় হয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, স্বামীর হত্যার পর আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে উঠে আসা এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়া—সব মিলিয়ে তাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার আদর্শ, দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখেছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি মনোযোগ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃঢ়তা তাকে সমর্থক ও সমালোচকের আলোচনায় রাখে। ২০০৮ সালের মামলায় তোলা বিভ্রান্তিকর অভিযোগ এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই তার রাজনৈতিক যাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শীর্ষ আদালত তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলে তার প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

গত এক বছরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। এই বছরের মে মাসে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর কয়েক দিন আগে হঠাৎ তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অনুকূল নয় এমন শ্বাসনালী সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার কারণে তিনি কোরোনারি কেয়ার ইউনিটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। দল-মত নির্বিশেষে মানুষ তার সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন।

তার ব্যক্তিগত জীবনের ব্যথা এখন একটি জাতির বেদনায় রূপ নিয়েছে। একজন নারী হিসেবে রাজনৈতিক শিখরে ওঠা, পরিবার বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান শারীরিক দুর্বলতা মিলিয়ে তার জীবন একটি গভীর মানবগল্পে পরিণত হয়েছে। তার সংগ্রাম, উত্থান-পতন এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জ মানুষের মনে আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা জাগিয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার নীরব ধৈর্য, সংযমী আচরণ এবং আধ্যাত্মিক শক্তি অনেকের চোখে অন্যরকম এক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আজ দেশজুড়ে যেভাবে সমবেদনা ছড়িয়ে পড়েছে তা কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি নয়, বরং একজন মা, একজন বোন এবং একজন রাষ্ট্রনেত্রীর প্রতি মানুষের গভীর মানবিক সাড়া।

এই সময় আমরা যে প্রার্থনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছি তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক মানবিক আবেদন, জীবনের বহু ঝড় অতিক্রম করা এক নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। জিয়া পরিবারের প্রতি দোয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই এবং চিকিৎসা সেবায় যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানাই, যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনো কখনো এমন একটি চরিত্র আসে, যার উপস্থিতি সময়কে বদলে দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই চরিত্র ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যার দৃঢ়তা অসংখ্য মানুষকে আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিয়েছে এবং যার সাহস রাষ্ট্রক্ষমতার অর্থকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তার পথচলা ছিল সাহসে ভরা দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে প্রতিটি অগ্রগতি প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে নীরব অথচ শক্তিশালী ঘোষণা।

তার জীবন ছিল নিরন্তর সংগ্রামের গল্প। ব্যক্তিগত ক্ষতি, অপবাদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা এবং ষড়যন্ত্রের বহু অধ্যায় তিনি বরণ করেছেন। স্বামী ও সন্তানকে হারানোর বেদনা এবং অন্য সন্তানদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট তিনি মর্যাদার সঙ্গে বহন করেছেন। তবুও তিনি ঘৃণার উত্তরে ঘৃণা দেখাননি। তার নীরবতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা নৈতিক দৃঢ়তা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রত্যাখ্যান করার উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। তার দল আজও তার সমতুল নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি, কারণ দলটি দাঁড়িয়ে আছে তার নীতি, বিচক্ষণতা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে।

একসময় তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তিনি যদি সেই পদে যেতে পারতেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং দৃঢ় নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায় দেখতে পেত। কিন্তু প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই সম্ভাবনাকে থামিয়ে দিয়েছে।

আজ তিনি জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সারা দেশ দোয়া করছে। প্রধান উপদেষ্টাও তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং চিকিৎসায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

দেশ-বিদেশের চিকিৎসকেরা নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করছেন এবং কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র উন্নত চিকিৎসার আগ্রহ জানিয়েছে। জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর ভালোবাসা ও দোয়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো এবং সকলকে দোয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

এই সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শের আকাঙ্ক্ষা একজন সন্তানের কাছে খুবই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে হয়তো সব কিছু সম্ভব হচ্ছে না, তবে পরিস্থিতি শান্ত হলে বহু দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে এবং স্বদেশে ফিরে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর দিন একদিন অবশ্যই আসবে।

তিনি এখনো আমাদের মাঝে আছেন এবং তার উপস্থিতি নিজেই এক দৃঢ়তার উৎস। বর্তমানের তরুণেরা দেখছে যে এই দেশে এমন এক নারী আছেন, যিনি প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতিকে নীরব সাহস দিয়ে পরাজিত করেছেন। তার জীবন এখনো নক্ষত্রের মতো দীপ্ত এবং যতদিন তিনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন, ততদিন সেই দীপ্তি প্রজন্মকে পথ দেখাবে। একদিন তার প্রস্থান যখনই আসুক, তা হবে একটি যুগের সমাপ্তি। কিন্তু আজ তিনি জীবনের সঙ্গে লড়াই করা এক অবিনাশী শক্তির প্রতীক।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

২০ মিনিট আগে

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

১ দিন আগে

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

২ দিন আগে