
শাহাবুদ্দিন শুভ

কিছু সংবাদ শুধু খবর হয়ে আসে না, বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। নিজ জাতি ও নিজের পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমেরিকার একটি সিদ্ধান্ত তেমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে ‘অগ্রহণযোগ্য হারে’ কল্যাণমূলক সুবিধা গ্রহণ করছেন।
এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত ‘Immigrant Welfare Recipient Rates by Country of Origin’ শিরোনামের তালিকায় দেখান, আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নেপালের নাম থাকলেও ভারতের ও শ্রীলঙ্কার নাম না থাকা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। একই অঞ্চলের দেশ হয়েও কেন বাংলাদেশ এই ধরনের নেতিবাচক তালিকায় জায়গা পেল? এটি আমাদের সমাজ ও প্রবাসী বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, যেসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত কল্যাণ কর্মসূচির ওপর অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় নির্ভরশীল, সেসব দেশের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। আমেরিকা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা আর এমন অভিবাসন চায় না, যারা কাজের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান না রেখে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গত দুই দশকে অভাবনীয় হারে বেড়েছে। ২০০০ সালে যেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ হাজার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজারে। অর্থাৎ দুই দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫৬৯ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই বাড়তি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে যুক্ত না হয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় বিষয়টি আর শুধু অভিবাসন বা কল্যাণ নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি কূটনৈতিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার কি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারবেন? আমেরিকা যেহেতু বিষয়টিকে মানবিক নয়, বরং অর্থনৈতিক বোঝা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, তাই এই পথ সহজ হবে না।
তবে কূটনীতির পাশাপাশি আমাদের প্রবাসী বাস্তবতাও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি নিয়মিত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তার দায় শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়। যারা সত্যিই অসুস্থ, অক্ষম বা বিপর্যস্ত, তাদের সহায়তা পাওয়া মানবিক অধিকার। কিন্তু সক্ষম হয়েও কাজ না করে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল থাকা শুধু নৈতিক নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ক্ষতিকর।
আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এটি কেবল ভিসা স্থগিতের ঘোষণা নয়, এটি আমাদের প্রবাসী আচরণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ভাবমূর্তির আয়না। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—আমরা প্রবাসীরা কি নিজেদের পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান ধরে রাখতে পারব? কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি জাতির মর্যাদা শুধু সরকারের নীতিতে নয়, তার নাগরিকদের আচরণেই সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
*লেখক ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক। ইমেইল: [email protected]

কিছু সংবাদ শুধু খবর হয়ে আসে না, বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। নিজ জাতি ও নিজের পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমেরিকার একটি সিদ্ধান্ত তেমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে ‘অগ্রহণযোগ্য হারে’ কল্যাণমূলক সুবিধা গ্রহণ করছেন।
এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত ‘Immigrant Welfare Recipient Rates by Country of Origin’ শিরোনামের তালিকায় দেখান, আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নেপালের নাম থাকলেও ভারতের ও শ্রীলঙ্কার নাম না থাকা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। একই অঞ্চলের দেশ হয়েও কেন বাংলাদেশ এই ধরনের নেতিবাচক তালিকায় জায়গা পেল? এটি আমাদের সমাজ ও প্রবাসী বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, যেসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত কল্যাণ কর্মসূচির ওপর অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় নির্ভরশীল, সেসব দেশের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। আমেরিকা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা আর এমন অভিবাসন চায় না, যারা কাজের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান না রেখে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গত দুই দশকে অভাবনীয় হারে বেড়েছে। ২০০০ সালে যেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ হাজার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজারে। অর্থাৎ দুই দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫৬৯ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই বাড়তি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে যুক্ত না হয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় বিষয়টি আর শুধু অভিবাসন বা কল্যাণ নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি কূটনৈতিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার কি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারবেন? আমেরিকা যেহেতু বিষয়টিকে মানবিক নয়, বরং অর্থনৈতিক বোঝা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, তাই এই পথ সহজ হবে না।
তবে কূটনীতির পাশাপাশি আমাদের প্রবাসী বাস্তবতাও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি নিয়মিত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তার দায় শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়। যারা সত্যিই অসুস্থ, অক্ষম বা বিপর্যস্ত, তাদের সহায়তা পাওয়া মানবিক অধিকার। কিন্তু সক্ষম হয়েও কাজ না করে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল থাকা শুধু নৈতিক নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ক্ষতিকর।
আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এটি কেবল ভিসা স্থগিতের ঘোষণা নয়, এটি আমাদের প্রবাসী আচরণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ভাবমূর্তির আয়না। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—আমরা প্রবাসীরা কি নিজেদের পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান ধরে রাখতে পারব? কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি জাতির মর্যাদা শুধু সরকারের নীতিতে নয়, তার নাগরিকদের আচরণেই সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
*লেখক ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক। ইমেইল: [email protected]
আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।
চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।