logo
মতামত

সততার দুর্ভিক্ষে চরিত্রের ঐশ্বর্য

ইজাজ আহসান৬ দিন আগে
Copied!
সততার দুর্ভিক্ষে চরিত্রের ঐশ্বর্য
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সোশ্যাল মিডিয়া আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছেলে-বুড়ো প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে এর প্রতি আসক্ত। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে ইউটিউবারদের মধ্যে ভিউ, লাইক ও শেয়ার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে নানা তথ্য সমেত কন্টেন্টের বন্যা বইতে থাকে। এসবের মধ্যে অনেক কথাই থাকে অন্তঃসারশূন্য, আবার অনেকগুলোর উদ্দেশ্যও থাকে মতলবি—নিজেকে বা নিজের দলকে মহান হিসেবে তুলে ধরা।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার একটি আলোচনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একজন বর্ষীয়ান ইসলামি দলের নেতা মত প্রকাশ করছিলেন যে, আমাদের বর্তমান সব সংকটের মূলে রয়েছে চরিত্রহীনতা, ন্যায়নীতি ও সততার অভাব।

প্রচলিত ধারণা হলো—জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সম্পদের অভাবই অর্থনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। আংশিক সত্য হলেও বাস্তবতা আরও গভীর। যদি শুধু সম্পদের অভাবই সমস্যার কারণ হতো তবে নাইজেরিয়ার মতো বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশ দারিদ্র্যের নিচে থাকত না। আবার সিঙ্গাপুর—যার নিজস্ব সম্পদ বলতে প্রায় কিছুই নেই—কঠোর শাসন, সুশাসন ও সততার ভিত্তিতেই বিশ্বের ধনী দেশের সারিতে উঠে এসেছে।

নাইজেরিয়ার পতনের মূলে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। বলা হয় অফিসের টেবিলে পর্যন্ত ঘুষের হার লেখা থাকে। বিপরীতে সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ দীর্ঘ তিন দশক ক্ষমতায় থেকেও নিজের চরিত্রে কালিমা লাগতে দেননি। তার সততা ও নৈতিকতা একটি দরিদ্র, দুর্নীতিগ্রস্ত দেশকে উন্নত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করেছে।

আমাদের দেশেও আজ দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, মনে হয় সততার দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। পত্রিকায় দেখলাম—২৫ হাজার টাকা বেতনের এক পেশকারের তিন কোটি টাকার বাড়ি! প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক পিয়নের ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের কথা প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন। কর কর্মকর্তার ছেলের ১৫ লাখ টাকার ছাগল কেনার কাহিনিও দেশবাসীর অজানা নয়। এসব ঘটনা এখন আর মানুষকে বিস্মিত করে না।

সভ্য দেশে এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সরকার পড়েও যেতে পারে। অথচ এখানে এইসব দুর্নীতিবাজেরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়—ডাকাতি, ভূমিদখল, মাদক ব্যবসা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চালিয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য একটাই—ক্ষমতা, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা। এ জন্য তারা শক্তিশালী দুর্নীতির চক্র গড়ে তোলে, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, এমনকি সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরাও জড়িত থাকে। সবচেয়ে বড় কথা—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিই যদি সৎ না হন, তাহলে নিচের স্তরে সততা টেকানো অসম্ভব।

ইসলামি দলের সেই নেতার কথায় তাই গভীর সত্য আছে—বাংলাদেশে সম্পদের অভাব নেই, অভাব আছে সৎ চরিত্রের। দেশ অসৎ মানুষের নয়; বরং অসৎ লোকদের দৌরাত্ম্যে সৎ মানুষের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এক নামকরা গায়ক একসময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন—“চেয়ারগুলো বেহায়াদের জন্যই বানানো।” যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ—বলা হয় ঠিকই, কিন্তু তা কি প্রকৃত নিয়ম? বাস্তবে দুর্নীতিবাজরাই অবৈধ টাকায় ক্ষমতার চেয়ার দখল করে, আর সেখান থেকে তারা আরও সুরক্ষিতভাবে অপকর্ম চালায়।

এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে রাজনীতির আসনে সৎ, যোগ্য ও চরিত্রবান মানুষকে বসাতে হবে। রাজনীতির ভিত যদি সততা আর নৈতিকতার ওপর দাঁড়ায়, তাহলে বাকিটা ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা অপরিসীম—অর্থনীতি থেকে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে। বিদেশে থেকে আমরা যারা দেশকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তারা এটি আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি।

সমস্যা সম্পদ নয়—সমস্যা চরিত্রের, মানসিকতার, আর সৎ মানুষের কণ্ঠরোধের। রাজনৈতিক নেতাদের ওলি-আউলিয়া ভাবার সুযোগ নেই। সভ্য দেশে একটি গুরুতর অপরাধই তাদের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানে। আমাদের দেশে এটিই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

এখনই সময়—হয়তো শেষবারের মতো—সততার দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে চরিত্রের ঐশ্বর্যকে সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠা করার।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক বিভাগীয় প্রধান (ব্যবসা শিক্ষা), বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাস্কাট, ওমান।

ইমেইলঃ <[email protected]>, ফেসবুকঃ Syed Ahsan

আরও দেখুন

ব্যাংকিং খাতে গভীর ক্ষত: বাংলাদেশ কি পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পাবে?

ব্যাংকিং খাতে গভীর ক্ষত: বাংলাদেশ কি পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পাবে?

জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো সংস্কার সফল হবে না। যেকোনো অনিয়ম প্রকাশ পেলে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এগুলো শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং এক ধরনের মানসিক বার্তাও তৈরি করে যে অপরাধী রেহাই পায় না। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে লুটপাটের প্রধান শক্তি ছিল বিচারহীনতা।

১০ ঘণ্টা আগে

ফ্রান্সের পথে পথে: যেদিন আইফেল টাওয়ার বিক্রি হয়ে গিয়েছিল

ফ্রান্সের পথে পথে: যেদিন আইফেল টাওয়ার বিক্রি হয়ে গিয়েছিল

১৯২০-এর দশকে ইউরোপ তখন যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতায় কাঁপছে। আইফেল টাওয়ার তখনো এতটা জনপ্রিয় নয়। রক্ষণাবেক্ষণে খরচ বাড়ছে, আর শহরে গুজব—টাওয়ারটা নাকি ভেঙে ফেলা হতে পারে। এই সুযোগটাই কাজে লাগালেন বিশ্বখ্যাত প্রতারক ভিক্টর লাস্টিগ।

১০ ঘণ্টা আগে

খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং নীরব শক্তির প্রতিচ্ছবি

খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং নীরব শক্তির প্রতিচ্ছবি

এই সময় আমরা যে প্রার্থনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছি তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক মানবিক আবেদন, জীবনের বহু ঝড় অতিক্রম করা এক নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। জিয়া পরিবারের প্রতি দোয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই এবং চিকিৎসা সেবায় যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানাই, যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন।

১২ ঘণ্টা আগে

অনন‍্য সাধারণ এক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা গামা আব্দুল কাদির

অনন‍্য সাধারণ এক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা গামা আব্দুল কাদির

গামা আব্দুল কাদির সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনে বাংলাদেশ অ্যাসেসিয়েশনের পাচঁবার সভাপতি এবং তিনবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি এখনো এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ, অস্ট্রেলিয়া এবং আওয়ামী লীগের অস্ট্রেলিয়া শাখারও প্রধান উপদেষ্টা।

৫ দিন আগে