logo
মতামত

সুটস্যারের সাতকাহন

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন১২ দিন আগে
Copied!
সুটস্যারের সাতকাহন
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

(এক অসহায় কর্পোরেট কর্মীর করুণ-হাস্যকর স্মৃতিকথা)

আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল তিনটা:

১) ছোটবেলায় ফরেষ্ট অফিসার না হয়ে ব‍্যাংক কর্মকর্তা হওয়া;

২) কর্মকর্তা হয়ে প্রাইভেট ব্যাংকে যোগ দেওয়া;

৩) আর প্রাইভেট ব‍্যাংকে যোগ দিয়ে সুট-টাইকে নিজের “অধিকারভুক্ত দাসত্ব” মনে করা!

সুট পরার আগে আমার জীবন বেশ ভালোই ছিল। শরীর ছিল আলগা, মন ছিল হাওয়াই, আর পেট ছিল একটু এগিয়ে কিন্তু সেটাকেও আমি ‘সৌন্দর্যের আধুনিক বক্ররেখা’ বলতাম।

কিন্তু যেদিন থেকে সুট-টাই গায়ে উঠল, মনে হলো আমি কোনো মানুষ নই আমি যেন একদম ভাঁজ করা কাপড়ের হ্যাঙার।

সকালের যুদ্ধ, সুট বনাম আমি

প্রতিদিন সকালে সুটের সঙ্গে আমার ময়দানী লড়াই বাধে।

সুটটা এমনভাবে ঝুলে থাকে যেন বলছে, “আয়, আজ আবার কোথা থেকে ইজ্জত খুইয়ে আসবি?”

আমি সুটটা একবার ধরলে সে দুবার হাত ফসকে যায়।

মনে হয় যেন নিনজা ট্রেনিং নিচ্ছে সারাক্ষণ!

টাইটার জায়গা হলো টাই।

টাই বেঁধে যতই স্মার্ট লাগুক, গলার ভেতর মনে হয় কোনো অদৃশ্য হাত আস্তে আস্তে খুন করছে, আবার ভাবি, এ হয়তো প্রিয়তমা স্ত্রী তানিয়ার সরু দুই হাত, হাজার গোস্সাতেও খুন করবে না।

আমি কখনো কখনো আয়নায় তাকিয়ে ভাবি, “টাই যদি ফাঁস হয়, তাহলে এটা কি অফিস নাকি ফাঁসির মঞ্চ?”

অফিস যাওয়ার পথে দুর্দশা

বাসে–ট্রামে উঠলেই সবাই এমনভাবে জায়গা দেয় যেন আমি বিয়ের মণ্ডপে যাচ্ছি।

এক আন্টি তো একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, “বাবা, বউয়ের কাছে যাচ্ছ নাকি পাত্রী দেখতে?”

আমি বললাম, “আন্টি, অফিসে যাচ্ছি।”

আন্টি দুই সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “…তোমাদের অফিস খুব ভদ্রলোকোচিত!”

অফিসে প্রথম প্রবেশ ভিআইপির ভুল ধারণা

অফিসে ঢুকতেই সিকিউরিটি গার্ড এমন সালাম দেয় যেন আমি এমপি হয়ে এসেছি।

সহকর্মীরা দেখলে মাথা নিচু করে চলে যায় সম্মান না, লজ্জায় হাসি চাপতে না পেরে।

বস দেখলে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, “ওহ! দেখতেতো…আজ একদম এক্সিকিউটিভ!”

মনে মনে আমি ভাবি, “স্যার, এই সুটের ভেতর আমার শরীর চিপসের প্যাকেটের মতো কুঁচকে গেছে! একে এক্সিকিউটিভ না বলে এক্সট্রা-টাইট বলা উচিত।”

স্ত্রীর সঙ্গে লেখক
স্ত্রীর সঙ্গে লেখক

সুটের বিশ্বাসঘাতকতা

মিটিং রুমে বসতেই সুটের বোতামটা টিক করে সামনে ছিটকে গিয়ে টেবিলের ওপর পড়ল।

পাশের সহকর্মী ভেবেছিল কোনো ঘোষণা হচ্ছে—

“কোনো নোটিশ নাকি?”

আমি বললাম, “না ভাই, সুটের বিদ্রোহ চলছে।”

টাইটার জায়গা হলো পিছনের সেলাই।

একদিন অফিসে চেয়ার থেকে উঠতেই পেছন থেকে পিছ্ছস! আওয়াজ।

সবাই তাকিয়ে দেখল, আমি খুঁজছি-

“কাপড় ছিঁড়েছে নাকি সম্মান?”

লাঞ্চ ব্রেকে বিপত্তি

লাঞ্চ খেতে গিয়ে আমার সুট এমনভাবে টাইট হয়ে গেল যেন পেটের দিকে ‘সাবধান! বিস্ফোরক!’ সাইনবোর্ড লাগানো আছে।

এক বন্ধু বলল, “দেখ, তোর সুট বলে খাবি-তো? ভেবেচিন্তে খা!”

আমি বললাম, “আমি তো! কিন্তু সুট খেতে দেয় না। এইবার মনে হচ্ছে সুটটাই ডায়েট কন্ট্রোল করছে!”

বিকেলে টাইয়ের প্রতিশোধ

বিকেল ৪টার দিকে টাইয়ের গিঁট ঢিলা করতে গিয়ে ভুল করে টেনে ফেললাম উল্টো দিক।

তখন মনে হলো গলায় কেউ ব্রেক মারল।

শ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম।

মনে মনে ভাবলাম, “টাই হচ্ছে একমাত্র জিনিস যা ফ্যাশনের নামে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা করতে বাধ্য করে!”

দিন শেষের মুক্তি সুটের দুঃখ, আমার আনন্দ

বাড়ি ফিরে সুট খুলতেই মনে হলো আমি যেন ধড়-মোড়া খুলে মুক্তি পেলাম।

সুটটাকে আলমারিতে রাখলাম।

সে ঝুলে ঝুলে এমনভাবে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন পুরোদিন সে-ই কাজ করেছে!

মনে মনে সুটটি নিশ্চয়ই বলছিল, “মানুষ, কালকে আবার আমাকে টেনে-পিষে বের করতে আসবি? আমাকেও তো একটু আরাম করতে দে!”

আমি সুটটাকে বললাম, “চিন্তা করিস না, কালকে ক্যাজুয়াল ডে। কালকে তুই আর আমি, দুজনেই ঘুমাব!”

সুটটা যেন খুশিতে আলমারির ভেতর ছোট্ট ডিসকো নাচ দিল, “উই হু! বাঁচলাম!”

*সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড

আরও দেখুন

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

১ দিন আগে

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

২ দিন আগে

কবিতা: রংধনুর লুটোপুটি

কবিতা: রংধনুর লুটোপুটি

রাত পোহালেই রূপালি ভোর/ মানুষের বীজ আর মানুষ চেনে না/ তবুও মানুষের হাঁটুজল পেরোতেই ডিঙ্গি লাগে।

৮ দিন আগে