logo
মতামত

ব্যাংকিং খাতে গভীর ক্ষত: বাংলাদেশ কি পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পাবে?

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন৩০ নভেম্বর ২০২৫
Copied!
ব্যাংকিং খাতে গভীর ক্ষত: বাংলাদেশ কি পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পাবে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। কোনো সময় প্রশংসার কারণ হয়ে ওঠে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সাফল্যের জন্য, আবার কোনো সময় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে অব্যাহত অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে। বছরের পর বছর ধরে এই খাতের নানাবিধ অপব্যবহার একটি এমন ক্ষত তৈরি করেছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। প্রশ্ন একটাই এই ক্ষত কি সত্যিই সারবে? নাকি ব্যাংকিং খাত একটি চিরস্থায়ী আস্থাহীনতার রোগে ভুগতে থাকবে?

লুটপাট শব্দটি ব্যবহার করা হয় তখনই, যখন অনিয়ম আর দুর্নীতির সীমা সাধারণ ভুলভ্রান্তির বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অসংখ্য অনিয়মিত ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ, ঋণখেলাপির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেওয়া ও ফেরত না দেওয়া, ব্যর্থ ঋণের পুনঃতফসিল এবং পরে আবারও বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ এই সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে একধরনের নৈতিক পতন ঘটেছে। যখন একজন সৎ উদ্যোক্তা সঠিক পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও যথাযোগ্য ঋণ পান না, অথচ প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী অসংখ্য শর্ত ভঙ্গ করেও বিপুল অঙ্কের ঋণ পেয়ে যায়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সমস্যা শুধু আর্থিক নয় এটি নীতিগত ব্যর্থতা, পরিচালনার দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের যৌথ ফলাফল।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মানুষের আস্থায়। ব্যাংক শব্দটির সঙ্গে মানুষের যে নিরাপত্তাবোধ জড়িত, তা দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ বাজার অর্থনীতির প্রাণ হলো ক্রেডিট বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঠামো। যদি জনগণ মনে করে ব্যাংকে তাদের আমানত নিরাপদ নয় বা বেশির ভাগ ঋণ কখনোই ফেরত আসে না, তাহলে ব্যাংকই আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারে না। অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনাগুলো একে একে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার ফলে এই আস্থাহীনতা শুধু বাড়ছেই। মানুষ প্রশ্ন করে ব্যাংকে টাকা রাখার কি আদৌ কোনো নিরাপত্তা আছে?

ব্যাংক খাতে অনিয়মের আরেকটি বিরূপ প্রভাব হলো খেলাপি ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়ে যাওয়া। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেই আর্থিক সংকটে পড়ে। যখন একটি ব্যাংক পরিচালনা ক্ষতির মুখে পড়ে, তখন তা কাটিয়ে উঠতে নানা ধরনের জটিল আর্থিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। কখনো আমানতের সুদ কমে যায়, কখনো ঋণের সুদ বাড়ে, কখনো ব্যাংক পুনঃপুঁজিকরণে সরকারি টাকার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ জনগণের করের টাকা দিয়ে বেসরকারি বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের ক্ষতি পূরণ করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি অনৈতিক ও অন্যায্য প্রক্রিয়া। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে কেন সাধারণ মানুষকে অন্যের লুটপাটের মূল্য দিতে হবে?

এ ক্ষেত্রে কঠিন বাস্তবতা হলো, কোনো অর্থনৈতিক খাতই স্থায়ীভাবে এমন সংকট সহ্য করতে পারে না। লুটপাটের একটি ধারাবাহিকতা থাকলে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায়, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যায়, বৈদেশিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও অস্থিরতা বাড়ে। কারণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণহীনতা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলে।

তবে প্রশ্ন হলো এই ক্ষত কি সারবে? একটি ক্ষত সারতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সঠিক রোগ নির্ণয়। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের রোগটি শুধু অপব্যবহারের নয়, বরং পরিচালনা কাঠামোর গভীরে প্রোথিত দুর্বলতা ও অসম প্রতিযোগিতার। অনেক ব্যাংক শুরু থেকেই যোগ্য পেশাদার ব্যাংকারদের পরিবর্তে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা সীমিত, তদারকি ব্যর্থ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য। এসব উপাদান মিলেই শরীরে সংক্রমণের মতো লুটপাটকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ক্ষত সারাতে হলে চিকিৎসা অবশ্যই কঠোর হতে হবে। প্রথমত, ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারত্ব বাড়াতে হবে। যে দেশের ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যই ব্যাংকিং বা ফাইন্যান্স সম্পর্কে যথাযথ সম্যক ধারণা রাখেন না, সে দেশে গভীর আর্থিক সংকট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ জনবল নিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এসব আবশ্যকীয় পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। যদি ঋণ অনুমোদনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ডিজিটাল ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে অনিয়ম অনেকাংশে কমবে। আর যেসব ঋণখেলাপি দীর্ঘদিন ধরে ফেরত দিতে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কিন্তু ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো সংস্কার সফল হবে না। যেকোনো অনিয়ম প্রকাশ পেলে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এগুলো শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং এক ধরনের মানসিক বার্তাও তৈরি করে যে অপরাধী রেহাই পায় না। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে লুটপাটের প্রধান শক্তি ছিল বিচারহীনতা। যদি এ সংস্কৃতি ভাঙা যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অপব্যবহার কমে আসবে।

চতুর্থত, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক খাত মানুষের উপার্জিত অর্থের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা পেতে হলে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় নীতি কঠোর করতে হবে। অনিয়মে জড়িত একটি ব্যাংকের জন্য কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। সকল ব্যাংকের জন্য সমান নিয়ম প্রযোজ্য করতে হবে, সরকারি বা বেসরকারি কোনোটিকেই ছাড় দিলে আস্থা ফিরে আসবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যাদের কারণে ব্যাংক খাতে এই ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাদের দায় সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো খাতে দীর্ঘদিন ধরে অপব্যবহার চলতে থাকলে তা কখনই শুধুমাত্র কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নয়; বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ থাকে। এদের বিচ্ছিন্ন না করলে ক্ষত সারবে না।

তবে এতসব জটিলতার মধ্যেও আশা আছে। বিশ্বের অনেক দেশই গভীর আর্থিক সংকট পার হয়ে ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করেছে। শর্ত একটাই সৎ ইচ্ছা, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং নীতিগত সংস্কারের প্রতি আপসহীন প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশেও যদি এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই ব্যাংক খাতের ক্ষত সারানো সম্ভব।

অর্থনীতি একটি জীবন্ত অঙ্গনের মতো। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে এটি পুনর্গঠিত হয়, শক্তিশালী হয়, পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। আজ বাংলাদেশ ব্যাংক খাত যে ক্ষতের মুখোমুখি, তা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হলেও অচিকিৎসাযোগ্য নয়। কঠোর নজরদারি, ন্যায়সংগত নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংক খাত আবারও জনআস্থার জায়গায় ফিরে আসতে পারে।

প্রশ্নটি তাই হতাশার নয়, অভিযাত্রার। ক্ষত সারবে কি? উত্তর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন চাই, তাহলে এই ক্ষত একদিন অবশ্যই সেরে উঠবে। আর যদি আমরা পুরনো ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করি, তাহলে ক্ষত আরও গভীর হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের হাতেই।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি

আরও দেখুন

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

৩৭ মিনিট আগে

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

১ দিন আগে

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

২ দিন আগে