logo
মতামত

মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া

ফারহানা আহমেদ লিসা
ফারহানা আহমেদ লিসা১১ ডিসেম্বর ২০২৫
Copied!
মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া

প্রবাসে আমার কর্মস্থল একটি হাসপাতালে। আমি চিকিৎসক। ৯ ডিসেম্বর আমি হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলাম। সেদিন ছিল মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ও মৃত্যু দিন।

ওই দিন হাসপাতালে এক রোগীর ইমার্জেন্সি সার্জারি লাগবে। কল করে এক নারী সার্জনের সঙ্গে কথা বললাম। একটু পর ভাসকুলার সার্জনের সঙ্গে রোগীর বিষয়ে আলাপ ছাড়াও কবে ছুটি নেব এবং তার দিনকাল কেমন চলছে আলাপ করতে গিয়ে দেখলাম বেশির ভাগ সাব স্পেশালিটিতে অনকল এখন নারী ডাক্তাররা।

সমাজ সংস্কারক, চিন্তাবিদ, ঔপন্যাসিক বেগম রোকেয়া অন্ধকার ঘরে বসে প্রকৃত দাম না পাওয়া মেয়েদের জন‍্য যে পথ তৈরি করে গেছেন, আজকের এই দিনে তিনি হয়তো আমাদের দেখে অনেক খুশি হতেন।

বেগম রোকেয়া ১৯০৪ সালে লিখেছিলেন ‘সুলতানার গল্প’, যেখানে ছিল কাল্পনিক আদর্শ নারীবাদি সমাজের গল্প। রংপুরের পায়রাবন্দের শিক্ষিত জমিদার বংশের মেয়ের প্রজ্ঞা এত বেশি ছিল, বুঝে গিয়েছিলেন যোগ‍্য সন্মান দিলে ক্ষতি নেই। সংসার সুন্দর আনন্দময় হয়। আর ‘অবরোধবাসিনী’–তে বলে গেছেন কটাক্ষ করে কাউকে কষ্ট ও অবহেলা করলে আর যাই হোক তার হৃদয়ে ভালোবাসা আর সন্মানের জায়গা করে নেওয়া যায় না।

একই দিন দুপুরের দিকে এক বন্ধু ফোন দিল। ওর ছেলের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে, মন খারাপ।

বললাম, ‘কেন কী বলেছে বাবু?’

বন্ধু বলল, ‘কোথা থেকে শুনে এসেছে ইসলামে চার বিয়ে জায়েজ, আমাকে বলেছে। মাত্র ১১ বছরের শিশু যদি এমন কথা বলে!’

বললাম, ‘বাবুকে বলো, মায়ের পায়ের তলায় বেহেস্ত। এতবড় সন্মানের কথা যে ধর্মে বলা হয়েছে, সে ধর্মে যেনতেন হেন কারণে চার বিয়ে জায়েজ এমন কথা সরাসরি কোথায় লেখা আছে?

‘পুরো কোরআনজুড়ে বিভিন্ন ঘটনার ঘটার পর আয়াত নাজিল হয়েছে একটা পুরো জীবনব‍্যবস্থা দেওয়ার জন‍্য। আমাদের রাসুল (সা.)–এর জীবনী আমাদের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। যে জীবনে যুদ্ধ ছিল, হিজরতও ছিল, বিজয়ের পুরো সামর্থ থাকার পরও মক্কা বিজয় না করে ফিরে আসা এবং পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ও ছিল। যুদ্ধে পুরুষ লোক কমে যাওয়ায় আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে দাসী, বিধবাসহ সন্মানিত নারীরা যাতে স্ত্রীর মর্যাদা পেতে পারেন সেটা বোঝানো হয়েছে। মানুষ সবাইকে সমানভাবে দেখতে পারবে না বলে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বহু বিবাহ। ধর্মে কোথাও সরাসরি মানুষকে অসন্মান করতে বলা হয়নি, সেটা নারী বা পুরুষ যেই হোক। অসুস্থ মানসিকতা বহু বিয়ে, পরকিয়া, অনাচার বা অত‍্যাচার করাকে ধর্মের নামে কিছু লোক জায়েজ করার চেষ্টা করছে।

‘তাই বেগম রোকেয়া লিখে গেছেন, “ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমনীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন”।

‘বাবু বড় হলে বুঝিয়ে বলবে কাউকে অসন্মান করে জীবনে সুখী হওয়া যায় না। সৃষ্টিকর্তার কাছাকাছি যাওয়া যায় না। আর শারীরিক ক্ষমতা বা বিত্তের ক্ষমতা খুব ক্ষণস্থায়ী।’

লেখক
লেখক

এর মাঝে নার্স একটা কার্ড দিয়ে গেল। এক রোগীর লোক পৌঁছে গিয়েছেন হাসপাতালে। একজন প্রবল ক্ষমতাশীল লোক মারা যাবার আগে জীবনের শেষ কয়েকটা দিন একটু আরামে কাটাতে পারার জন‍্য আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে লিখে গেছেন খুব সুন্দর কিছু কথা। সেটা বন্ধুকে পড়ে শোনালাম। তারপর বন্ধুকে বললাম, বাবুকে বুঝিয়ে আদর করে ধৈর্য় নিয়ে বড় করতে। ও যে সিঙ্গেল মা, ওকে পারতে হবে।

কাজ করতে করতে রাত হয়ে আসছে। জানালার বাইরের অন্ধকারে মনে হচ্ছে ছোট্ট বেগম রেকেয়া মোমের আলোয় লুকিয়ে ভাইয়ের কাছে পড়ছেন, শিখছেন। ১৯০২ সাল থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে শুরু করে। কুসংস্কারমুক্ত এবং মুক্ত মনের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় ইংরেজি ভাষাতেও তার দক্ষতা বাড়ে।

স্বামীর মৃত্যুর পর তার টাকায় প্রথম ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯১৬ সালে মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন তৈরি করেন। ১৯৩০ সালে মুসলিম বাংলা সম্মেলনে বাংলা ভাষার পক্ষে বক্তব‍্য দেন। বিজয়ের মাসে বাংলাভাষী তার একজন উত্তরসুরী আমি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে আমেরিকায় বসে কাজ করছি আর তাঁকে স্মরণ করছি।

সাহিত্য কর্ম আর সমাজ সংস্কারক তাকে পরিণত বয়সে তার স্বামী দেখে যেতে পারেননি। কত আনন্দিতই না তিনি হতেন। আসলে নারী বা পুরুষ অনেকে অপরের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নন, এটা যত তাড়াতাড়ি সবাই বোঝেন ততই ভালো।

মাত্র ৫২ বছর বয়সে মারা যান তিনি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বেগম রোকেয়াকে। রংপুরে তার স্মৃতি কেন্দ্রের গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরিতে ঘুরে আসার স্বপ্ন নিয়ে আজকের মতো বাসার পথে ফিরে চলেছি।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*ফারহানা আহমেদ লিসা: সান ডিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

আরও দেখুন

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

১৬ মিনিট আগে

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

১ দিন আগে

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

২ দিন আগে