
রহমান মৃধা

ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্র নয়; নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। আন্দিজ পর্বতমালা, ক্যারিবীয় সাগর ও বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট ভেনেজুয়েলাকে যেমন অনন্য করেছে, তেমনি এর প্রাকৃতিক সম্পদ একে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য করে তুলেছে।
তবে গত এক দশকে দেশটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। দুর্নীতি, অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে দেশটির সার্বভৌমত্ব অনেকের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলাকে শুধু সংকটের চোখে দেখলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। চীন দেশটিকে জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং বিপুল বিনিয়োগ ও তেল আমদানির মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ভেনেজুয়েলার দিকে নতুন করে তাকাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন বাড়ানো যায়, তবে ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন ভূমিকা রাখতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ জ্বালানির বিকল্প খোঁজার প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আজকের বিশ্বে একটি স্পষ্ট প্রবণতা হলো—ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। সামরিক চাপের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমেই কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভেনেজুয়েলা এই বাস্তবতার প্রতীক। তবু দেশটিকে কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
এই আলোচনা আমাদের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ‘আকর্ষণীয়’ ছিল মূলত তার কৌশলগত অবস্থান, সস্তা শ্রম ও উন্নয়নের বয়ানের কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রায়ই নির্ধারিত হয় সে দেশ তার জনগণের জন্য কী করছে তার চেয়ে বেশি—সে বিশ্বব্যবস্থাকে কী সরবরাহ করতে পারছে তার ভিত্তিতে।
কিন্তু এই ধরনের আকর্ষণ টেকসই নয়। যে রাষ্ট্র কেবল সম্পদ বা কৌশলগত সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সে শেষ পর্যন্ত একটি ‘বিষয়’-এ পরিণত হয়, পূর্ণাঙ্গ সত্তা হয়ে উঠতে পারে না। টেকসই গুরুত্ব আসে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা যুক্ত হয়।
ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব নয়, স্বার্থই স্থায়ী। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি। তবেই একটি দেশ শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিতে নয়, নিজের নাগরিকদের কাছেও সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্র নয়; নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। আন্দিজ পর্বতমালা, ক্যারিবীয় সাগর ও বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট ভেনেজুয়েলাকে যেমন অনন্য করেছে, তেমনি এর প্রাকৃতিক সম্পদ একে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য করে তুলেছে।
তবে গত এক দশকে দেশটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। দুর্নীতি, অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে দেশটির সার্বভৌমত্ব অনেকের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলাকে শুধু সংকটের চোখে দেখলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। চীন দেশটিকে জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং বিপুল বিনিয়োগ ও তেল আমদানির মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ভেনেজুয়েলার দিকে নতুন করে তাকাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন বাড়ানো যায়, তবে ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন ভূমিকা রাখতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ জ্বালানির বিকল্প খোঁজার প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আজকের বিশ্বে একটি স্পষ্ট প্রবণতা হলো—ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। সামরিক চাপের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমেই কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভেনেজুয়েলা এই বাস্তবতার প্রতীক। তবু দেশটিকে কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
এই আলোচনা আমাদের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ‘আকর্ষণীয়’ ছিল মূলত তার কৌশলগত অবস্থান, সস্তা শ্রম ও উন্নয়নের বয়ানের কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রায়ই নির্ধারিত হয় সে দেশ তার জনগণের জন্য কী করছে তার চেয়ে বেশি—সে বিশ্বব্যবস্থাকে কী সরবরাহ করতে পারছে তার ভিত্তিতে।
কিন্তু এই ধরনের আকর্ষণ টেকসই নয়। যে রাষ্ট্র কেবল সম্পদ বা কৌশলগত সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সে শেষ পর্যন্ত একটি ‘বিষয়’-এ পরিণত হয়, পূর্ণাঙ্গ সত্তা হয়ে উঠতে পারে না। টেকসই গুরুত্ব আসে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা যুক্ত হয়।
ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব নয়, স্বার্থই স্থায়ী। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি। তবেই একটি দেশ শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিতে নয়, নিজের নাগরিকদের কাছেও সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।
চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।
রাত পোহালেই রূপালি ভোর/ মানুষের বীজ আর মানুষ চেনে না/ তবুও মানুষের হাঁটুজল পেরোতেই ডিঙ্গি লাগে।